Select Page

সন্দ্বীপের পুরনো ম্যাপঃ ১৯১৩-১৯২৯

প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে ভাষা আন্দোলন বার্ষিকীর সময় প্রখ্যাত কবি হাসান হাফিজুর রহমানের “অমর একুশে” কবিতার কয়েকটি লাইন সবার মনে দাগ কেটে যায়। যেমনঃ- “সালাম, রফিকউদ্দিন, জব্বার কী বিষন্ন থোকা থোকা নাম। এই একসারি নাম তার বর্শার তীক্ষ্ণ ফলার মতো এখন হৃদয়কে হানে;”। ঠিক তেকনি আমাদের সনদ্বীপ বাসীদের জন্যেও এরকম কিছু নাম আছে সেগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ করে। ন্যামস্তি, ইজ্জতপুর, বাটাজোড়া, হুদ্রাখালী, রোহিণী, পুরনো সন্দ্বীপ টাউন এমন আরো কতো নাম। অনেক মোজা/গ্রামের নাম আছে যেগুলোর সাথে বর্তমান প্রজন্মের কোনো পরিচিতিই নেই। সন্দ্বীপে এমনো পরিবার আছে যারা নদী ভাঙ্গনের কারণে আটবার বাড়িঘর বিলীন হওয়ার পর এখন সেনের হাটের কাছে বসবাস করছেন।

সন্দ্বীপ ডেভেলপমেন্ট ফোরামের এক সভায় সম্মানিত উপদেষ্টা জনাব আহমদ মোস্তফা সন্দ্বীপের পুরনো ম্যাপের বিষয়ে আগ্রহ ব্যাক্ত করেন। তাঁর এক নাতি জানতে চেয়েছিলেন সন্দ্বীপ কতো বড় ছিলো। তিনি পরামর্শ দেন আগারগাও জাতীয়া আর্কাইভে গিয়ে খোঁজ করতে।

যথারীতি একদিন গেলাম। সেখানকার সংশিষ্ট্রা দ্রুত সহায়তা করলেন। পুরনো ম্যাপের রুমে আমাকেও নিয়ে গেলেন। বাংলাদেশের প্রতিটি এলাকার পুরোনো ম্যাপ ওখানে আছে। আমি রীতিমতো উত্তেজনায় কাঁপছি। ১৯১৯ থেকি ১৯২৯ পর্যন্ত ৩টি ম্যাপ পাওয়া গেল। সরকারী নিয়ম মেনে তাঁর ম্যাপগুলো স্ক্যান করে দিলেন।

সম্প্রতি সন্দ্বীপের পশ্চিমে নদী ভাঙ্গন বন্ধ হয়ে নতুন চর জেগে ওঠায় সবার আগ্রহ দেখার মতো ছিল। বাপ দাদার বসতভিটা কে না ফেরত চায়। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতায় তা সুদুর পরাহত হয়ে ওঠে। বিশেষ করে অধুনালুপ্ত ন্যামস্তি (প্রাচীন দলিল অনুযায়ী – ন্যামস্তী) গ্রামের জায়গায় যে নতুন চর জেগে ওঠেছে সেটার মালিকানা ও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রশ্নে বিষয়টি জটিল আকার ধারণ করেছে। এই জন্য মোশারফ হোসেন খাদেম’কে আহ্বায়ক করে ১৭ সদস্য বিশিষ্ট “সন্দ্বীপ সীমানা রক্ষা কমিটি ঢাকা” গঠিত হয়। এর সদসয় সচিব আবু সুফিয়ান ও সমন্বয়ক নুরুল আক্তার। কমিটির মুখপাত্র জনাব মনিরুল হুদা বাবন বাদি হয়ে মামলা দায়ের করেন এবং এবং গত ২৭/০৫/২০১৮ তারিখে উচ্চ আদালত ৬০ দিনের মধ্যে দিয়ার জরিপের মাধ্যমে ৬০ মৌজার সীমানা বুঝিয়ে দিতে রুল দিয়েছেন। কিন্তু প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে সন্দ্বীপবাসীর সেই অপেক্ষা এখনো শেষ হয়নি।

ডঃ রাজীব হুমায়ুনের সন্দ্বীপের ইতিহাস সমাজ অ সংস্কৃতি বইতে সন্দ্বীপের ৬২ মৌজার উল্লেখ আছে। এবিএম সিদ্দিক চৌধুরীও ৬২ মৌজার কথা বলেছিলেন। ইএয়ানিং শোনা যাচ্ছে ৬০ মৌজার কথা। আমরা সন্দ্বীপের একটি পুরনো ম্যাপের ৬০ মৌজারই সন্ধান পেয়েছি। এ দূটো নাম প্রাপ্ত ম্যাপে নেই। এ দুটো গ্রাম চিটাগাং রেকর্ডস বইতে পাওয়া যায়। রামপুর আর ম্যাপে প্রাপ্ত শ্রীরামপুর এক হতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে সিদ্ধি, নোয়াপাড়া, মিঠাপুকুরিয়া অথবা অন্য কোন অধুনা বিলুপ্ত মৌজা হতে পারে।

ইদানিং ফেসবুকে আমেরিকা প্রবাসী মজিবুল আলম খান ও জগলুল হায়াত খানের সুত্রে সন্দ্বীপের ৬০ মৌজার একটি তালিকা দেখা যায়। এতে পাঁচবাড়িয়া, শরীফপুর ও উদয়কালীর পরিবর্তে হুদ্রাখালী, মিঠাপুকুরিয়া ও সাইবুদ্দিনা নাম পাওয়া যায়। মজার ব্যাপার হচ্ছে উক্ত ম্যাপে “হুদ্রাখালি” মৌজার নাম নেই। অথচ হুদ্রাহালি আমাদের খুব পরিচিত নাম। উক্ত ম্যাপে চ হুদ্রাখালি ও থাক হুদ্রাখালির নাম। অধুনা লুপ্ত কাঠগড়ের বদুরগো বাড়ি প্রাচীন ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষেও হুদ্রাখালিতে বদুওগো আগের বাড়ির অস্তিত্ব ছিল। আসলে সন্দ্বীপের অস্তিত্ব এত পরিবর্তণ হয়েছে, কত নাম মেঘনার জনে হারিয়া গেছে তাঁর কোন ইয়াত্তা নেই। এই গাঙ্গীয় ব-দ্বীপে আর কোন দ্বীপের ম্যাপের এত পরিবর্তন হয়েছে কিনা আমাদের জানা নেই। আমরা প্রাপ্ত ম্যাপ অনুযায়ী ৬০ মৌজার নাম দিলাম। মোজাগুলোর নামের বানান ডঃ রাজীব হুমায়ুনের সন্দ্বীপের ইতিহাস সমাজ ও সংস্কৃতি বই অনুযায়ী দেয়া হয়েছে।

সন্দ্বীপের ৬০ মৌজার নাম (১৯১৩-১৯১৬ ম্যাপ অনুযায়ী) ঃ

১) পাইয়াডগী, ২) শমশেরাবাদ, ৩) চর লক্ষ্মী, ৪) চর বদু, ৫) চর পীরবক্স, ৬) চর রহিম, ৭) মোক্তারপুর, 8) রোহিণী, ৯) ইজ্জতপুর, ১০) মোহাম্মদপুর, ১১) শ্রীরামপুর, ১২) আমিরাবাদ, ১৩) মন্ডিন, ১৪) ন্যামস্তি, ১৫) সাবিদমুহুরী, ১৬) আজিমপুর, ১৭) রহমতপুর, ১৮) হরিশপুর, ১৯) দুবলাপাড়, ২০) বাঁউআ, ২১) কাজিরখিল, ২২) বাটাজোড়া, ২৩) শফিনগর, ২৪) কাটগড়, ২৫) চর হাদ্রাখালী, ২৬) দীর্ঘাপাড়, ২৭) চর সন্তোষপুর, ২৮) সন্তোষপুর, ২৯) চেউরিয়া, ৩০) আমানুল্লা, ৩১) কালাপানিয়া, ৩২) গাছুয়া, ৩৩) চর গাছুয়া, ৩৪) চর বাউরিয়া, ৩৫) বাউরিয়া, ৩৬) কাছিয়াপাড়, ৩৭) চর কাছিয়াপাড়, ৩৮) কুচিয়ামোড়া, ৩৯) হারামিয়া, ৪০) মুসাপুর, ৪১) মাইটভাঙ্গা, ৪২) সাতঘরিয়া, ৪৩) সারিকাইত, ৪৪) সুলতানপুর, ৪৫) কমলপুর, ৪৬) পাঁচবাড়িয়া, ৪৭) শরীফপুর, ৪৮) বৈঠা, ৪৯) চৌকাতলী, ৫০) মগধরা, ৫১) থাক কাছিয়াপাড়, ৫২) থাক বাউরিয়া, ৫৩) থাক দীর্ঘাপাড়, ৫৪) থাক হুদ্রাখালী, ৫৫) থাক সন্তোষপুর ৫৬) থাক গাছুয়া, ৫৭) থাক কুচিয়ামোড়া, ৫৮) চর দীর্ঘাপাড়, ৫৯) চর কুচিয়ামোড়া, ৬০) চর উদয়কালী।

বিশ্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে ১৯১৩-১৯১৬ সি এস জরিপের (Cadastral Survey) ম্যাপে সন্দ্বীপের ১০১ টি মৌজার কথা বলা হয়েছে। যে মৌজাগুলি নদী সিকস্তি হয়ে বিলীণ হয়ে গেছে সেগুলোর কোন নাম দেয়া হয়নি। শুধু ম্যাপের নীচে ফুট নোটে উল্লেখ করা হয়েছে। এই জন্যই প্রথম মৌজা পাইয়াডগীর ক্রমিক নং ১৭ এবং সর্বশেষ মোজা চর বাটার ক্রমিক নং ১০১ দেয়া হয়েছিল। উপরোল্লিখিত ৬০টি মোজা ছাড়াও তখন আরো ৩টি মৌজার অস্তিত্ব ছিল। এগুলো হচ্ছে,- চর নাংগুলিয়া, চর আমানুল্লা ও চর বাটা। এ জায়গার অংশ বর্তমানে নোয়াখালীর অধীনে চলে গেছে। আগ্রহী পাঠক জাতীয় আর্কাইভ থেকে সংগৃহীত ম্যাপগুলো আমার ওয়াবসাইট www.digitalsandwip.com এ দেখতে পারেন।

সুত্রঃ
১) সন্দ্বীপের ইতিহাস সমাজ ও সংস্কৃতি – ডঃ রাজিব হুমায়ুন (১৯৮৭);
২) শিকড়ের সন্ধানে – শেখ মোঃ আব্দুল বায়েছ খান (২০১৫);
৩) উড়ির চর অতীত ও বর্তমান – এবিএম সিদ্দিক চৌধুরী (২০১৪)।

লেখকের গ্রামের বাড়ি বাউরিয়া। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ।
সম্পাদনকৃত বইঃ
১) স্মৃতিময় সন্দ্বীপ টাউন হারিয়ে খুঁজি তাঁরে – (জনাব এবিএম সিদ্দিক চৌধুরীর সাথে);
২) মাওলানা আবদুল আউয়াল জৈনপুরীর “মাজাল্লিতুল আদীব লী আযিল্লাতিস সন্দ্বীপ” – (অনুবাদ মাওলানা বশির আহমেদ)।

Previous

Next

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *